দেশে মহামারি করোনাভাইরাস রুদ্রমূর্তি ধারণ করেছে। টানা দুই সপ্তাহ রেকর্ড সংখ্যক রোগী শনাক্ত হয়েছে।

প্রতিদিনই এই সংখ্যা আগের দিনের তুলনায় বাড়ছে। রোগী সামাল দিতে স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছে।

এমন পরিস্থিতিতে রাজধানীর মহাখালীর ডিএনসিসি কাঁচাবাজারকে আইসোলেশন সেন্টারে রূপান্তরের ব্যবস্থা করা হয়েছে। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে এখানে দুইশো শয্যার আইসিইউ/এইচডিইউসহ হাজার শয্যার হাসপাতাল চালু করা সম্ভব হবে বলেও জানানো হয়েছে।

তবে প্রয়োজনীয় অনেক যন্ত্রপাতি ও চিকিৎসা সরঞ্জামের সরবরাহ এখনো নিশ্চিত করা হয়নি। মঙ্গলবার মহাখালীতে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) মার্কেটে নির্মিতব্য কোভিড ডেডিকেটেড হাসপাতাল পরিদর্শনে যান স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী জাহিদ মালেক। পরিদর্শনকালে তিনি বলেন, এক বছর ধরে মহাখালী কাঁচাবাজারের ওই স্থাপনা বিদেশগামী মানুষের করোনা পরীক্ষা করা হতো।

এখন এই স্থাপনাটিতে করোনা রোগীদের চিকিৎসায় হাসপাতাল স্থাপন করা হবে। এখানে ২০০টির বেশি আইসিইউ শয্যা স্থাপন করা হচ্ছে। এক সঙ্গে এক হাজার ২০০-এর বেশি মানুষ করোনা চিকিৎসা নিতে পারবেন।

এতদিন এক লাখ ৮০ হাজার ৫৬০ বর্গফুট আয়তনের ফাঁকা এ মার্কেটটি করোনার আইসোলেশন সেন্টার এবং বিদেশগামীদের করোনা পরীক্ষার ল্যাব হিসাবে ব্যবহৃত হয়েছিল। এখন করোনা হাসপাতাল চালু হলে বিদেশগামীদের জন্য এক পাশে পৃথকভাবে জায়গা রাখা হবে।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, করোনার দ্বিতীয় ঢেউ প্রতিরোধে ঢাকার সব হাসপাতালে শয্যা বাড়ানোর ব্যবস্থা করছি। আড়াই হাজার শয্যাকে পাঁচ হাজার করা হয়েছে, এর চেয়ে বেশি বাড়ানো সম্ভব নয়।

প্রতিদিন যদি চার-পাঁচ হাজার রোগী বাড়ে তাহলে সারা শহরকে হাসপাতাল বানালেও সামাল দেওয়া সম্ভব নয়।

তিনি বলেন, আমি আশা করি, জনগণ নিষেধাজ্ঞা মেনে চলবেন। প্রশাসন ব্যবস্থা নিচ্ছে, জনগণ সচেতন হচ্ছে। তবে সতর্ক না হলে মনে রাখতে হবে, পাঁচ হাজার শয্যার পর হাসপাতালগুলোতে এক ইঞ্চি জায়গা নেই আর শয্যা স্থাপনের।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ডিএনসিসি মার্কেটে যেসব চিকিৎসা সরঞ্জাম প্রয়োজন তার মধ্যে রয়েছে, ম্যাকানিক্যাল ভেন্টিলেটার ইউথ এনআইভি মোড ৮৭টি, মাল্টিপ্যারামিটার ২২৭টি, সিরিঞ্জপাম্প ৫৪০টি, ইনফিউশন পাম্প ১৫০টি, হাইফ্লো ন্যাজাল ক্যানুলা ৩১০টি, ডিফেব্রিলেটার ১৪টি, আইসিইউ শয্যা ৫৫টি, এইচডিইউ শয্যা ২৪০টি, ডায়ালাইসিস মেমিন উইথ আরও চারটি, সাকশস মেশিন ৮২টি, নেবুলাইজার ৫০টি, পালস অক্সিমিটার ৬০টি, ১২ লেড চ্যানেলের ইসিজি মেশিন ২৬টি, ব্লাড গ্যাস এনালাইজার তিনটি, সেমি অটোমেটেড বায়োকেমিস্ট এনালাইজার তিনটি, ইনকিউবেটর তিনটি, সেন্ট্রিফিউজ মেশিন আটটি, ব্লাডব্যাংক রেফ্রিজারেটর চারটি, পোর্টেবল হ্যালোজেন স্পটলাইট পাঁচটি, পোর্টেবল অক্সিজেন কনসানট্রেটর ৩০টি, পোর্টেবল আলট্রাসাউন্ড স্ক্যানার ইউথ ইসিএইচও ৪টি, পোর্টেবল এক্সরে ম্যাশিন আটটি, অটোমেটিক সেল কাউন্টার দুটি, অটোমেটিক বায়োকেমিক্যাল এনালাইজাই তিনটি, ফ্রিজার ৭০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড চারটি, অটোক্লেভ ৭০ লিটার দুটি, জিনএক্সপার্ট মেশিন দুটি, বায়োসেফটি ক্যাবিনেট দুটি, কো-গ্লুমিটার সিসটেম দুটি, আলট্রাসনোগ্রাম মেশিন দুটি, ৫০০ এমএ এক্সরে মেশিন দুটি, সিটিস্ক্যান মেশিন একটি, আরটিপিসিআর মেশিন দুটি, অক্সিজেন ফ্লোমিটার অয়েল মাউন্টেড ৫০০টি, অক্সিজেন ফ্লোমিটার সিলেন্ডার ৩০০টি, অক্সিজেন সিলেন্ডার ৩০০টি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ডিএনসিসি করোনা আইসোলেশন সেন্টারে এই বিপুল পরিমাণ চিকিৎসা সরঞ্জামের অভাব থাকলেও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সিএমএসডিতে (সেন্ট্রাল মেডিকেল স্টোরস ডিপোর্ট) বেশির ভাগ প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম নেই।

সিএমএসডির তালিকায় দেখা যায়, সেখানে হাইফ্লো ন্যাজাল ক্যানুলা রয়েছে ৩৩১টি, নেবুলাইজার মেডিশন আছে ২০টি, ১২ চ্যানেলের ইসিজি মেশিন আছে ২৫টি, পেশেন্ট মনিটর ৫৩টি, আইসিইউ শয্যা রয়েছে ৩৬১টি, সাকশন মেশিন আছে একটি।

সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা জানান, তালিকায় যেসব যন্ত্রপাতির উল্লেখ রয়েছে সেগুলোর দু-একটি ছাড়া বাকি সবই অতিপ্রয়োজনীয় চিকিৎসা উপকরণ। হাসপাতাল চালু করা হলেও এসব প্রয়োজনীয় চিকিৎসা যন্ত্রপাতি যত দ্রুত সম্ভব ক্রয় ও স্থাপনের ব্যবস্থা করতে হবে। কারণ এসব যন্ত্রপাতি ছাড়া কোভিড রোগীদের চিকিৎসা এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা সম্ভব হবে না।

এ প্রসঙ্গে ভাইরাসবিদ ডা. জামালউদ্দিন যুগান্তরকে বলেন, কোভিড চিকিৎসায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রীয় অক্সিজেন (হাইফ্লো ন্যাজাল ক্যানুলা) সরবরাহ ব্যবস্থা। করোনার প্রকৃত চিকিৎসা, আইসিইউ নয়। করোনা চিকিৎসায় গতানুগতিক চিকিৎসার পাশাপাশি সেন্ট্রাল বা কেন্দ্রীয় অক্সিজেন সরবরাহ সিস্টেম তথা হাইফ্লো অক্সিজেন সরবরাহ নিশ্চিত ছাড়া আর উল্লেখ করার মতো তেমন কিছুই লাগে না।

আইসিইউ সব রোগীর প্রয়োজনও হয় না। মহাখালীস্থ ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন মার্কেট তথা রূপান্তরিত ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন হাসপাতালে শতাধিক আইসিইউসম্পন্ন হাসপাতালটি হয়তো আগামী এক সপ্তাহেই চালু হচ্ছে। প্রকৃতপক্ষে এটি কতটা করোনা রোগীর চাপ কমাবে তা অনিশ্চিত।

সরকার সম্প্রতি ঢাকা এবং ঢাকার বাইরে বেশ কিছু হাসপাতালে সেন্ট্রাল অক্সিজেন সিস্টেম চালু করেছে। সবাই ঢাকাতেই চিকিৎসা নিতে চায়। কারণ ঢাকায় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের আনাগোনা। কিন্তু করোনা চিকিৎসায় বিশেষজ্ঞের প্রয়োজন হয় না, সেটা অনেকেরই অজানা। ঢাকার চাপ কমাতে সেসব হাসপাতালে রোগী পাঠানোর ব্যবস্থাপনা বা রোগী সেসব হাসপাতালে রেফার করার ব্যবস্থা কেন করা হচ্ছে না? আইসিইউর পেছনে ছুটে ঢাকার রাস্তায় মৃত্যুবরণ করার চেয়ে সেসব হাসপাতালে চিকিৎসা গ্রহণ করলে মৃত্যুর হারও কমত আর হাহাকারও থামত।

চিকিৎসা সরঞ্জামের বিষয়ে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিকসমূহ) যুগান্তরকে বলেন, আমরা দেশের সব হাসপাতালের চাহিদা সংগ্রহ করেছি।

বিশেষ করে যেসব হাসপাতালে কোভিড রোগীদের চিকিৎসা হয়। ইতোমধ্যে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জামের তালিকা সিএমএসডিতে পাঠানো হয়েছে। আশা করছি তারা দ্রুত সেগুলো কিনে হাসপাতালে সরবরাহ করবে।

 

আমাদের ফেইসবুক Link : ট্রাস্ট নিউজ ২৪

By Desk