হেফাজতে ইসলাম গত ২৬ ও ২৮ মার্চ রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ব্যাপক তাণ্ডব চালিয়েছে। এ ঘটনায় ঢাকাসহ ৯ জেলায় গতকাল বুধবার পর্যন্ত ৪৩টি মামলা হয়েছে।

এর মধ্যে ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকায় ১১টি, হাটহাজারীসহ চট্টগ্রাম জেলায় ৭, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ৮, নারায়ণগঞ্জে ৭, ফরিদপুরে ২, ভোলায় ২, হবিগঞ্জে ২, কিশোরগঞ্জে ৩ ও মৌলভীবাজার জেলায় ১টি মামলা হয়েছে। এদিকে ১৩ দফা দাবিতে হেফাজতে ইসলাম ২০১৩ সালের ৫ মে ঢাকা অবরোধ করে এবং মতিঝিলের শাপলা চত্বরে ব্যাপক তাণ্ডব চালায়। পরদিন নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের সানারপাড়সহ দেশের বিভিন্ন স্থানে তাণ্ডব চালায়। সেই সময় এ ঘটনায় ৬৬টি মামলা হয়েছিল। এই ৬৬টি মামলারও পুনরায় তদন্ত শুরু হয়েছে। জড়িতের বিরুদ্ধে চার্জশিট দিয়ে তাদের আইনের আওতায় আনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ-বিক্ষোভের নামে গত কয়েক দিনে ঢাকা-ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ সারা দেশে তাণ্ডব চালায় হেফাজতে ইসলাম। থানায় হামলা করে, সরকারি-বেসরকারি স্থাপনায় হামলা চালিয়ে আগুন দেয়। বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে হামলা চালায়। হরতালের নামে হেফাজতের কর্মীরা ব্রাহ্মণবাড়িয়া জুড়ে ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। একপর্যায়ে তারা ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ সংগীতাঙ্গন পুড়িয়ে দেয়। এছাড়া ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে তাণ্ডবলীলা চালায়। তাদের এই তাণ্ডবের পেছনে জামায়াত-শিবিরসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের শামিল থাকা ও সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পেয়েছেন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা।

একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তা জানান, হেফাজতের সঙ্গে কতিপয় রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী ও বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তাদের ফোনালাপ ও অর্থের লেনদেনের বিষয়টি তাদের নেটওয়ার্কে ধরা পড়েছে। এদের আইনের আওতায় আনা হবে। তাণ্ডবের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের আর ছাড় দেওয়া হবে না। রাষ্ট্র এত দুর্বল নয় যে কেউ যা কিছু করে চলে যাবে। এসব হতে দেওয়া হবে না। হরতাল ডেকে হেফাজতে ইসলামের নেতাকর্মীরা দেশ জুড়ে যে তাণ্ডব চালিয়েছেন, তাদের নির্দেশদাতাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ড. বেনজীর আহমেদ। তিনি বলেন, ‘হেফাজতের কর্মীরা হাটহাজারী থানা ও ডাকবাংলোয় আক্রমণ করে। ভূমি অফিস জ্বালিয়ে দেয়। যারা হামলা ও নাশকতা করেছে, তাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। তাদের নির্দেশদাতাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ চট্টগ্রাম ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় হেফাজতের হামলায় গুরুতর আহত পুলিশ সদস্যদের দেখতে গতকাল বুধবার দুপুরে ঢাকা সেনানিবাসে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) গিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।

পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি আনোয়ার হোসেন জানান, চট্টগ্রাম ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ঘটনায় আরো মামলার প্রস্তুতি চলছে। কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। তাণ্ডবে যারা জড়িত, তাদের সবাইকে আইনের আওতায় আনা হবেই।

সূত্র জানায়, হেফাজতকে গত আট বছর যাবত্ বিভিন্নভাবে লালন-পালন করেছে কতিপয় সংস্থা ও নেতা। সব সুযোগ-সুবিধা সরকারের কাছ থেকে নিয়েছে হেফাজত। তবে তাদের যে গোপন উদ্দেশ্য, তা সম্প্রতি সহিংসতার মাধ্যমে দেখিয়ে দিয়েছে। সবাইকে বুঝিয়ে দিয়েছে যে পূর্বের অবস্থা থেকে হেফাজত বদলায়নি। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময় জামায়াতুল মুজাহেদিন বাংলাদেশকে (জেএমবি) অনুরূপভাবে কতিপয় সংস্থা ও নেতা পালন-পালন করেছিলেন। ওই সময় আমেরিকার রাষ্ট্রদূত হ্যারি কে টমাস বলেছিলেন, ‘শায়েক আব্দুর রহমান ও বাংলা ভাইয়ের নেতৃত্বে উগ্রপন্থিরা একত্রিত হয়ে সর্বহারা নিধনের নামে নিরীহ মানুষকে হত্যা-নির্যাতনসহ তাণ্ডবলীলা চালাচ্ছে।’

কতিপয় বিএনপি নেতাও এই গোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে পড়েছিলেন। ঐ সময় বিএনপির কয়েক জন শীর্ষ নেতা বলেছিলেন, ‘দেশে বাংলা ভাই, ইংলিশ ভাই বলতে কিছুই নেই।’ এর কিছুদিন পরেই জেএমবি একযোগে একই সময়ে ৬৩টি জেলায় সিরিজ বোমা বিস্ফোরণের মাধ্যমে নিজেদের আত্মপ্রকাশ ঘটায়। এরই ধারাবাহিকতায় তারা আদালতসহ সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলায় চালায়। দুই বিচারপতিসহ অর্ধশত লোক নিহত হয়। আহত হয় সহস্রাধিক। একইভাবে হেফাজতকে লালন-পালন করার খেসারত এখন দিতে হচ্ছে। তবে সরকার হেফাজতের তাণ্ডব নিয়ন্ত্রণে কঠোর অবস্থানে গেছে।

চট্টগ্রাম অফিস জানায়, চট্টগ্রামের হাটহাজারীতে থানা ও বিভিন্ন সরকারি স্থাপনায় হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ এবং পটিয়া থানায় হামলার ঘটনায় হেফাজতে ইসলামের আড়াই হাজার নেতাকর্মীকে আসামি করে সাতটি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে হাটহাজারী থানায় ছয়টি ও পটিয়া থানায় একটি মামলা হয়েছে। চট্টগ্রাম জেলার পুলিশ সুপার এস এম রশিদুল হক গতকাল বুধবার ইত্তেফাককে এ তথ্য নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, হাটহাজারি থানায় হামলা ও সংঘর্ষের ঘটনায় পুলিশ চারটি মামলা করেছে। এছাড়া উপজেলা ও ইউনিয়ন ভূমি অফিসে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় ভূমি অফিসের পক্ষ থেকে দুটি মামলা করা হয়েছে। পটিয়া থানায় ভাঙচুরের ঘটনায় একটি মামলা হয়েছে। প্রতিটি মামলায় ৫০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ জন আসামি। এখনো আমরা কাউকে গ্রেফতার করিনি। মামলার তদন্ত শুরু হয়েছে। জড়িতদের শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি জানান, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় হেফাজতের তাণ্ডবের ঘটনায় মঙ্গলবার পর্যন্ত আটটি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় আসামি সাড়ে আট হাজারের বেশি। তবে এর মধ্যে হেফাজতে ইসলামের দায়িত্বশীল কোনো নেতা বা কর্মীর নাম নেই। মামলায় সব আসামিকেই অজ্ঞাত দুষ্কৃতিকারী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। বুধবার সকাল পর্যন্ত জেলার বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে তাণ্ডবের ঘটনায় ২১ জনকে আটক করেছে পুলিশ।

 

আমাদের ফেইসবুক Link : ট্রাস্ট নিউজ ২৪

By Desk